21 Sep 2017 : সিলেট, বাংলাদেশ :     |Bangla Font Error | Login |

সরেজমিন বালাগঞ্জ স্বপ্নার স্বপ্ন ভেসে গেছে পানিতে

20170706_135447

খালেদ আহমদ, বালাগঞ্জ থেকে ফিরে: তিন সন্তানের জননী স্বপ্না বেগম। স্বামী মারা গেছেন বছর দু’য়েক হয়। এর পর থেকেই অবুঝ সন্তানদের নিয়ে তার অভাবের সংসার। অন্যের বাড়িতে কাজ করেই দুই ছেলেকে লেখাপড়া করান এবং অন্নের যোগান দেন। সেই সংসারে হানা দিয়েছে অকাল বন্যা। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে স্বপ্নার স্বপ্ন। কান্নাজড়িত কন্ঠে বালাগঞ্জের পশ্চিম গৌরিপুর ইউনিয়নের দোহালিয়া গ্রামের মৃত বশির মিয়ার স্ত্রী স্বপ্না বেগম নেহার এ প্রতিবেদককে বলছিলেন তার দুর্ভোগের কথা। স্বপ্নার ঘরের ভেতর হাঁটু সমান পানি। রাতের আধাঁরে ঘরে ঢুকে ভেসে গেছে কাপড় চোপড়, ছেলেদের বইপত্রসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। এক সপ্তাহ যাবত সন্তানদের নিয়ে পানিবন্দি থাকলেও ভিজিডির ৫ কেজি চাল ছাড়া কোন সরকারী সহায়তা পাননি স্বপ্না।
স্বপ্নার মতই দোহালিয়া গ্রামের অনেকের স্বপ্ন এবারের আকস্মিক বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। দোহালিয়া গ্রামে প্রবেশ করলেই ছোট রাস্তার ডান পার্শ্বের বাড়িটি আরিফ উল্লাহর । পরিবারের নয় সদস্য নিয়ে ৬ দিন ধরেই পানিবন্দি তিনি। ঘরের ভিতরেই হাঁটু সমান পানি। তাই বাধ্য হয়ে ইট পুঁতে তার উপর খাট তুলে সেখানেই আশ্রয় নিয়েছেন সবাই। একটি খাটে বিছানার উপরেই রেখেছেন হাঁস-মুরগী। দুটি খাট একত্র করে তাতেই রান্না-খাওয়া থাকা সবকিছু। একেতো আরিফ উল্লাহর অভাবের সংসার। ছেলে ফুটপাতে চা বিক্রি করেন। নাতী-নাতনী নিয়ে কষ্টের সংসারে আরিফ উল্লাহর জন্য বন্যা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতকিছুর পরও সরকারী কোন সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছেনি। স্থানীয় ইউপি সদস্য ফজির আলী খোঁজ নেননা তাদের। নির্বাচনে পক্ষের ভোটার না হওয়ায় এমন আচরণ বলে অভিযোগ আরিফ উল্লাহর। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে ফজির আলীর বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ প্রতিবেদক ঘটনাস্থল থেকেই আরিফ উল্লাহর দুর্দশার কথা মোবাইল ফোনে সিলেটের জেলা প্রশাসক রাহাত আনোয়ারকে অবগত করেন। জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক বালাগঞ্জের ইউএনও প্রদীপ সিংহকে আরিফ উল্লাহর বাড়িতে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পরক্ষণেই ইউএনও নগদ অর্থ সহায়তা নিয়ে আরিফ উল্লাহর বাড়িতে যান। এতে মহাখুশি সত্তরোর্ধ আরিফ উল্লাহ।
আরিফ উল্লাহ এবং স্বপ্নার মতই বন্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন ছরকুম মিয়া, উস্তার মিয়া, ছায়াদ মিয়া, কয়েছ মিয়া, মুক্তার আলী, সবুল মিয়া, ইব্রাহিম আলীসহ পশ্চিম গৌরিপুর ইউনিয়নের শত শত মানুষ। বালাগঞ্জের দেওয়ান বাজার ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকা কুবেরাইল। দীর্ঘ পথ নৌকায় পাড়ি দিয়ে সেখানে গিয়ে দেখা যায় বন্যার্ত মানুষের হাহাকার। রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ এই এলাকার প্রায় সবগুলো বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। কোন কোন বাড়িতে লোকজন আসবাবপত্র নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে। অনেকেই সীমাহীন দুর্ভোগ সত্বেও মাঁচা বেঁধে বাস করছেন। এসব বন্যা পীড়িত মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেনি পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা। কুবেরাইল গ্রামের শরফ উদ্দিন জানালেন দশ কেজি চাল আর ৫০০ টাকা পেয়েছেন ৭ দিন আগে। এগুলো ৩ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। শরফ উদ্দিন, চমক আলী, সাবুল, পলাশ আর মনিরা বেগমের আর্তনাদ আমরা ত্রাণ চাই বাঁচতে চাই।
পুরো বালাগঞ্জ উপজেলাই বন্যা কবলিত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মানুষের দুর্ভোগের চিত্র। তবে সরকারী ত্রাণ সহায়তা অপ্রতুল দাবী উঠলেও সরেজমিন অনেক এলাকায় ত্রাণ বিতরণের চিত্র চোখে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের তৎপরতা চোখে পড়ে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ-উস-সামাদ চৌধুরীকে বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করতে দেখা গেছে। বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রদীপ সিংহ দৈনিক জালালাবাদকে বলেন, বন্যায় বালাগঞ্জের ৬টি ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলার দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছেন মানুষ। ৩৭৫ হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। ৫৪ টি বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। তিনি জানান, প্রতিদিন বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে যাচ্ছেন এবং খোঁজখবর রাখছেন। পাশাপাশি মেডিকেল টিম কাজ করছে। তবে বালাগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতি দু’ একদিনের মধ্যে উন্নতির দিকে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

(177 বার পড়া হয়েছে)

(Visited 1 times, 1 visits today)