21 Sep 2017 : সিলেট, বাংলাদেশ :     |Bangla Font Error | Login |

সিলেটে থামছে না তীর শিলংয়ের জুয়া

শাফী চৌধুরী: ভারতীয় শিলং তীর খেলা সিলেটে মহামারী আকার ধারণ করেছে। এ তীর খেলা এখন শুধু সীমান্তবর্তী এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্ত পেরিয়ে এ খেলা এখন সিলেটের অলিগলিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, এমনকি এ খেলা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যান্ত অঞ্চলেও। এ ‘তীর খেলা’য় বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নিচ্ছে। সিলেটের যেকোন এলাকায় বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা শিলং জুয়ায় বাজি ধরছে। এ খেলাটি সপ্তাহের ছয়দিনই বসছে । প্রতিদিন দুইবার এ খেলার ড্র অনষ্টিত হয়ে থাকে। সিলেটে তাদের এজেন্টের মাধ্যমে এদেশীয় এজেন্টরা ভারতের এজেন্টেদের সাথে জুয়ার আসরের সমন¦য় করে থাকে। আর ভারতীয় এ ভাগ্যের খেলায় স্কুল কলেজের ছাত্র, শিক্ষক,দিনমজুর, রিকশাচালক, যানবাহনের চালক-শ্রমিকসহ বেকার যুবকরা অংশ নিচ্ছে। আর এতে করে অনেক স্কুলগামী ছাত্ররা স্কুল ফাঁকি দিয়ে এ খেলায় অংশ নিচ্ছে এতে করে ছাত্রদের মনযোগ বইয়ের পরিবর্তে তীর খেলার দিকেই বেশী ঝুঁকছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেও দমন করা যাচ্ছে না এ জুয়া। গ্রেফতারের পর জামিনে বের হয়ে আবারও এ খেলায় জড়িয়ে পড়ছে জুয়াড়িরা। গত দু‘দিনে নগরী থেকে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩১ জন জুয়াড়িকে গ্রেফতার করে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ২০ থেকে ২৫ বছর পূর্বে ভারতীয় ধনকুবেররা এ রকম খেলাটি আবিস্কার করে। এর নাম রাখে মেঘালয়ের আঞ্চলিক ভাষায় ‘তীর খেলা’। স্থানীয় ভাবে খেলাটিকে অনেকেই শিলং তীর, ডিজিটাল নাম্বার খেলা ইত্যাদি নামে অবহিত করে থাকেন। খেলাটি ধরণ হচ্ছে এ রকম যে এদেশের এজেন্টদের মাধ্যমে ১-৯৯ পর্যন্ত নাম্বার বিক্রয় করা হয় যে কোন মূল্যে। লটারিতে ০ থেকে ৯৯ পর্যন্তযে কোনো সংখ্যা কিনে নেওয়া যায়। সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরা যায়।যত মূল্যে সংখ্যাটি বিক্রয় হবে তার ৭০ গুণ লাভ দেয়া হবে বিজয়ী নম্বরকে। অথাৎ ১০ টাকায় ৭০০ টাকা। একই নম্বর একাধিক লোকও কিনতে পারেন। সবাই কেনা দামের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি টাকা পাবেন।প্রতিদিন বিকাল সোয়া ৪টায় ও সাড়ে ৫টায় দুবার এ লটারির ড্র অনুষ্টিত হয়ে থাকে। খেলার ফলাফল দেওয়া হয় অনলাইনে। ভারতের শিলং থেকেিি.িঃববৎপড়ঁহঃবৎ.পড়স এ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জুয়ার আসরটি পরিচালনা করা হয়। আর এ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ফলাফল জানাও যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট শহরের কাজির বাজার ,শেখঘাট, বেতের বাজার, শামিমাবাদ, কাজলশাহ্, রিকাবীবাজার, মদিনা মার্কেট,কুমারগাঁও বাসষ্টেন্ড,তেমূখী,লামাকাজি টুকের বাজার,আখালিয়া,বালুচর ,টিলাগড়, আম্বরখানা, মেন্দিবাগ, কদমতলীসহ শহরের কয়েকশত স্পটে ভারতীয় এ জুয়ার আসর বসে থাকে। আর এসব জুয়ার নেতৃত্বে রয়েছেন প্রভাবশালী দলের নেতাকর্মীরা ও প্রশাসনের একাধিক ব্যাক্তি। তাছাড়াও থানার অসাধু কর্মকর্তাদের মাসোহারা দিয়ে চলছে এ খেলা।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যক্তি জানান- নাম্বার বইয়ের মালিকরা হোটেলে বসে নিরাপদে খেলার নাম্বার টুকন বিক্রয় করছেন। তাদের লিডারদের কারনে কোন কিছু বলতে পারছেনা হোটেল মালিকরা। তাদের দাবী ভারতীয় “তীর খেলা” লটারির বিক্রেতাদের নিকট থেকে আইনপ্রয়োগকারী দলের সদস্যরা বইপ্রতি ৫শত হতে ৬শত টাকা হারে চাঁদা আদায় করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছুপ্রভাবশালী ব্যক্তিরা উৎকোচের বিনিময়ে এলাকারপ্রকাশ্যে তীর খেলার দোকান স্থাপন ও টোকেন বিক্রয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন।

অপরদিকে সিলেট নগরী থেকে তীর খেলা দমন করতে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রেখেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ । মঙ্গলবার নগরীর সুরমা মার্কেট ও লালাবাজার এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ২৫ জন জুয়াড়িকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে দক্ষিন সুরমার লালাবাজার তীর শিলং ও জুয়ার আসর থেকে ১৪ জন এবং নগরীর সুরমা মার্কেট থেকে ১১ জনকে আটক করা হয়।
এসময় তাদের কাছ থেকে নগদ ষাট হাজার টাকা, ১১টি মোবাইল সেট ও জুয়া খেলার সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও পুলিশ সেখানকার অস্থায়ী জুয়ার আসর গুড়িয়ে দেয়। এ অভিযানে এডিসি (দক্ষিন) মো. জেদান আল মুসার নেতৃত্বে দক্ষিন সুরমা থানার সহকারী পুলিশ কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান ও দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে একই সময়ে অভিযান পরিচালনা করে সিলেট নগরীর সুরমা মার্কেট হতে তীর (জুয়া) খেলার সরঞ্জামাদিসহ ১১জনকে আটক করা হয়। এসময় তাদের কাছ থেকেপ্রায় আটাশ হাজার টাকা ও ১২টি মোবাইল সেট উদ্ধার করা হয়।

আটককৃতরা হলেন- ০১। মো. আলমগীর মিয়া (২২), পিতা-আপন মিয়া, গ্রাম-মহাজিরাবাদ, থানা-শ্রীমঙ্গল, জেলা-মৌলভীবাজার, ০২। সোহেল আহমদ (২৯), পিতা-মালেক আহমদ, সাং-খাদিমপাড়া, থানা-শাহপরাণ (রহ.), ০৩। হেমাল উদ্দিন (৩০), পিতা-মৃত হাজী মুছাব্বির, সাং-বড়গুল, থানা-গোয়াইনঘাট, ০৪। জজ আহমদ (২৮), পিতা-মৃত জমির হোসেন, সাং-ধলইপাড়া, থানা-শাহপরাণ (রহঃ), ০৫। আহিদ আহমদ জাবেদ (২১), পিতা-তবারক আলী, সাং-দাউদপুর, থানা-মোগলাবাজার ০৬। সাব্বির আহমদ (২০), পিতা-সানাই মিয়া, সাং-বন্ধন এফ-২৭, খাসদবীর, থানা-এয়ারপোট ০৭। সুমন পাল (২৫), পিতা-বিনয় পাল, সাং-টাকাটুকিয়া, থানা-তাহিরপুর, জেলা-সুনামগঞ্জ, ০৮। রিমন (২০), পিতা-হাবিব মিয়া, সাং-লাউয়াই, থানা-দক্ষিণ সুরমা, ০৯। আরিফ আহমদ (২২), পিতা-আব্দুল হক, সাং-দাউদপুর, থানা-মোগলাবাজার ১০। মো. সালেহ (৩০), পিতা-মৃত মোঃ আব্দুল মালিক, সাং-তিলক, থানা-জগন্নাথপুর, জেলা-সুনামগঞ্জ, ১১। মো. শাহজাহান মিয়া, পিতা-মখলিছ মিয়া, গ্রাম-উত্তর মোকামের গুল (পীরের বাজার), থানা-শাহপরাণ (রহঃ), ১২। মো. বাবুল মিয়া (৩২), পিতা- মৃত রইস আলী, সাং কুতুবপুর, ১৩। শেখ কামাল হোসাইন (২৮) পিতা- শেখ জুনাব আলী, সাং- কুতুব পুর, ১৪। লিটন আহমদ (২০), পিতা- আরশ আলী, সাং- কুতুব পুর ১৫। নোমান আহমদ (৩০) পিতা- মাসুদ মিয়া, সাং- মুছারগাও ১৬। শাহেদ আহমেদ (২৫) পিতা- মৃত রইছ আলী, সাং- নান্দিশ্রী, ১৭। গিয়াস উদ্দিন (৩৫), পিতা- আমির আলী সাং- নিজগাও ১৮। সোহাগ (২৮) পিতা- শহিদুল হক,সাং-মাছকান্দা, থানা- ময়মনসিংহ জেলা-ময়মনসিংহ, ১৯। সোলেমান আহমদ(২৫), পিতা-আরফান আলী, সাং ফরিদপুর, ২০। মনু মিয়া (৫০), পিতা- আলমগীর সাং-লালাবাজার, ২১। সুমন দাস (২৪) পিতা- রাজেশ দাশ, সাং নোয়াইর, থানা- বিশ্বনাথ, ২২। আতাউর রহমান (৪০) পিতা- মমিন, সাং-বিবিদইল, ২৩। জাকির হোসেন ইলিয়াস (৫৫), পিতা- মৃত আরিছ আলী, সাং বেতসন্ধি, থানা- বিশ্বনাথ, ২৪। লিটন মিয়া (৩০) পিতা- মোঃ আছরাব আলী, সাং রাজনগর, থানা- বিশ্বনাথ, ২৫। মৃদুল দেব (২২), পিতা- কাঞ্চন দেব, সাং- জানাইয়া, থানা- বিশ্বনাথ জেলা- সিলেট।

আটককৃতদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য জুয়া আইন-১৮৬৭ তে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জেদান আর মূসা জানান, মঙ্গলবার অভিযান চালিয়ে ২৫ জন জুয়াড়িকে আটক করা হয়েছে। শিলং তীর খেলার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। যেখানেই জুয়ার আসরের খবর পাচ্ছে সেখানেই স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় পুলিশ অপারেশন চালাচ্ছে। ইন্টারনেটে তীর খেলার সাইট বাংলাদেশে বন্ধ করার জন্য সিলেট মহানগর পুলিশ সরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে বিটিআরসিতে চিটি পাঠানো হয়েছে। শীঘ্রই সাইটটি বন্ধ করা হবে। তীর খেলার মূল মদদ দাতাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।

(1184 বার পড়া হয়েছে)

(Visited 1 times, 1 visits today)